তবে তাদের অভিযোগ, বাজেট ঘোষণার মাত্র তিনদিন আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জারি করা একটি এসআরও (স্ট্যাটিউটরি রেগুলেটরি অর্ডার) নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংগঠনগুলোর মতে, এতে আরোপিত শর্তের কারণে সাধারণ গ্রাহক, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কর-সুবিধার বাইরে থেকে যাবেন, ফলে সরকারের ঘোষিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে।
রাজধানীর বাংলামোটরে গতকাল ‘জাতীয় বাজেটে জ্বালানি খাত: নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বক্তারা। এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)। সহআয়োজক হিসেবে ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ (ইটিআই) বাংলাদেশ এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। সংবাদ সম্মেলনে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী।
ধারণাপত্র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর থেকে কর ও শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও উৎপাদন ব্যয় ৩০-৩৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসতে পারে। এতে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্য অর্জন তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। তবে একই সময়ে এনবিআরের জারি করা এসআরওতে এমন কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা মূলত বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিভিত্তিক (পিপিএ) সৌর প্রকল্পকেই সুবিধা দিচ্ছে। ফলে আবাসিক গ্রাহক, কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এ কর সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ধারণাপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বছরে কমপক্ষে ২১ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং সরকারি খাত থেকে অন্তত ৬ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উন্নয়ন খাতে মোট ১৭ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ৩৭৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা, অর্থাৎ ২ দশমিক ২ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন ট্রানজিশন ফান্ডের ৩০ কোটি টাকার ঋণসীমাকেও অত্যন্ত সীমিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাগরিক সমাজের মতে, বাজেটে যেখানে ৫ লাখ ৩২ হাজার নতুন কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে, সেখানে বিপুল সম্ভাবনাময় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা একাই ১০ লক্ষাধিক সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারত। এছাড়া এলএনজি আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর মওকুফ বহাল থাকায় জীবাশ্ম জ্বালানিকে পরোক্ষভাবে আরো সস্তা করার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে সমালোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বড়পুকুরিয়া ও দিঘিপাড়া কয়লাখনি সম্প্রসারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, কারণ দেশে প্রতি টন কয়লা উত্তোলনে প্রায় ১৭০ ডলার ব্যয় হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানীকৃত কয়লার দাম ৯০-১২০ ডলারের মধ্যে। ফলে এ ধরনের লোকসানমূলক প্রকল্প সম্প্রসারণকে অর্থনৈতিকভাবে অদক্ষ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, ‘বাজেটে ২০৩১ সাল পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের ওপর কর মওকুফের ঘোষণা আমাদের খুবই আশাবাদী করেছিল। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতার আগেই এনবিআর এমন এক শর্ত জারি করেছে, যা এ ঘোষণার মূল স্পিরিটের পরিপন্থী। আমরা আতঙ্কিত যে এনবিআর বা আমলাতন্ত্র কি সরকারের এই মহৎ উদ্দেশ্যকে পিছিয়ে দিতে চাচ্ছে? এছাড়া আমরা দেখছি একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানিকেও একই পরিমাণ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, যা আসলে কার্যকর কোনো পরিবর্তন আনবে না।’
বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘সরকারের টার্গেটগুলো মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছে, যা সরকারের ইমেজ বাড়িয়েছে। কিন্তু এ পজিটিভ ইমেজের সঙ্গে পারফরম্যান্সের মিল থাকতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজেট ও নীতিতে তার বাস্তব প্রতিফলন থাকতে হবে। শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত বরাদ্দ ও কার্যকর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা।’ একই সঙ্গে রাজধানীর বাইরে চলমান লোডশেডিং ও জ্বালানি বৈষম্য দূর করতেও কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ক্লিনের নেটওয়ার্কিং অ্যাডভাইজার মনোয়ার মোস্তফা বলেন, ‘এনবিআরের প্রজ্ঞাপনটি সম্পূর্ণ বৈষম্যমূলক। আপনি গ্রামের বাড়িতে দুই কিলোওয়াটের সোলার প্যানেল লাগাতে চাইলে কর ছাড় পাবেন না, কিন্তু বড় ইন্ডাস্ট্রি সেই সুবিধা পাবে। আমাদের দাবি, এই এসআরও পরিবর্তন করে সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’ এছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে প্রতি কিলোওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের জন্য ২৫ হাজার টাকা সরাসরি ইনসেনটিভ দেয়া এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রি-ফাইন্যান্সিং স্কিম চালু করার দাবিও জানান তিনি।
ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম বলেন, ‘একটি বাজেট তখনই অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, যখন তা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করে। বৈষম্য রেখে সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর সম্ভব নয়। ২০২৭ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আইন মেনে সাপ্লাই চেইন ডিকার্বনাইজ করতে হবে। তাই বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর হারের ওপর ভিত্তি করে কনসেশনাল ট্যাক্স বা বিশেষ কর সুবিধার কথা সরকারকে ভাবতে হবে।’
জলবায়ু কর্মী ফারাহ আনজুম বলেন, ‘আমরা যদি গ্লোবাল ট্রেন্ড দেখি, সবাই এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের জ্বালানি বাজেটের ৯৮ শতাংশই এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির দখলে। কাগজে-কলমে আমরা অনেক ভালো কথা বলছি, কিন্তু পলিসি আর বাজেটের মধ্যে বড় গ্যাপ থেকে যাচ্ছে। আমাদের দেশে যদি সোলার বুম ঘটাতে হয়, তবে সাধারণ হাউজহোল্ড লেভেলে মানুষকে সুবিধা দিতে হবে, যা এ বাজেটে অনুপস্থিত।’
সংবাদ সম্মেলন থেকে সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে এনবিআরের এসআরও বাতিল, ১০ বছরের জন্য সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের ওপর সব ধরনের কর ও শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ২৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনসহ সাত দফা দাবি জানানো হয়।